জোসনা রাতে পুকুরপাড়ে...

 

নিস্তব্ধ গ্রামের রাত্রী। ঝিঁঝি পোকার শব্দে নির্জন পুকুরপাড়টা সচকিত হয়ে উঠেছে।

আকাশে একফালি চাঁদ হেঁসে উঠেছে।

দূরপল্লী থেকে কুকুরের ঘেউঘেউ ডাক ভেষে আসছে।

মৃদু বাতাসের ঝাপটায়, তেঁতুলগাছের পাতাগুলো দুলছে। পুকুরের পানিতে আধখানা চাঁদ ভেষে উঠেছে;

থেকে-থেকে মাছেদের ঝাপটায় আবার তাহা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ছুটেচলা হিমেল হাওয়ার ছোঁয়ায় শরীরটা জুড়ে যাচ্ছে... 

গাছে-গাছে যেন ভালোলাগা ফলেছে।

সবমিলিয়ে চারদিকের পরিবেশটাকে বড্ড ভালোলাগছে!


(চৌদ্দ/চার/চব্বিশ)

রাত সাড়ে বারোটা|সবুজদের পুকুরপাড়ে|শরীয়তপুর

ভালোলাগার ভালোলাগা



 ঝুম বৃষ্টি, কি যে মিষ্টি! 

এশার নামাজপড়ে বেলকনিতে গেলাম। খুব গরম লাগতেছে। চারতলা থেকে নিচের দিকে তাকাতেই চমকে গেলাম। আরে, রাস্তায় ফোঁটা ফোঁটা জল কেন! ডানে-বামে তাকলাম, পুরো রাস্তা ফাঁকা। দু'একটা প্রাইভেট কার আসছে তো- দ্রুত ছুটছে। পিচঢালা রাস্তায় পানির ফোঁটাগুলো চিকচিক করছে। আকাশের দিকে তাকাতেই হৃদয়ে ঢেউ খেয়ে গেলো। এ-যে বৃষ্টি নামতেছে! লোহার গ্রিলের ভিতর দিয়ে হাতদুটো বাহিরে বাড়িয়ে দিলাম। মুক্তোসম বৃষ্টির ফোঁটাগুলো, হাতদুটো চুমতে লাগলো। হিমশীতল বৃষ্টির ফোঁটার ছোঁয়ায়, বদনে কি-এক অনুভূতি সৃষ্টি হলো। একেক বৃষ্টির ফোঁটায়, হাতের লোমগুলো শরীরের সাথে লেপ্টে যাচ্ছে। অপলক তাকিয়ে আছি আমি। হাতকে ছুঁয়ে দেয়া প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা, যেন হৃদয়কে ছুঁয়ে দিচ্ছে। ঝুম বৃষ্টির ছোঁয়ায়, বড়বড় বিল্ডিংগুলো চিকচিক করছে। মনে হয়, তারাও আমার মতো পুলকিত। নিচে তাকিয়ে দেখি, ছাতামাথায় একজন হেঁটে যাচ্ছে। দুতলার মাথা ছুঁয়েছে— নিমগাছটার পাতাগুলো বৃষ্টির ফোঁটায় আলতো দুলছে। সেই সাথে, জ্বলজ্বল করে উঠেছে। পার্শ্বের বিল্ডিং-এর দেয়াল বেয়েপড়া, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো, বাতির আলোয় খশেপড়া তারার মতো ছুটছে। পশ্চিমাকাশে— থেকে থেকে ঈষৎ বিজলী চমকাচ্ছে। সবমিলিয়ে চারদিকের পরিবেশকে, খুব মায়াময় লাগছে। ফুলের টবগুলোতে যেন, থোকা-থোকা ভালোলাগা ফলেছে!


আস্তিক

 আমরা দুঃখ-কষ্টের উদরে জন্ম নেয়া মানব সন্তান। তোমরা সুখসাচ্ছন্দ্যের ছায়াতলে বেড়েওঠা মানুষ্যপুত্র। দুঃখ-কষ্ট আর যাতনা আমাদের মাতৃকোল। কষ্ট তো ঈশ্বরের ছায়া; মৃত্যু হৃদয়ের চারণভূমিতে যা চাষ করা যায় না। আমরা বেদনাকাতর আত্মা নিয়ে বেড়েওঠি; আর বেদনা তো অনেক ভাড়ী পদার্থ। ক্ষুদ্র হৃদপিণ্ড যার ভারত্ব বহন করতে পারে না। আমরা অনবরত চোখ দিয়ে রক্ত ঝরাই। চিৎকার করে বিলাপ করি। আমাদের অশ্রুজলে যারা একবার স্নান করবে— আজন্ম শুদ্ধতার পরশ অনুভব করবে। তোমরা আমাদের ইতিকথা, পরিচয়-পরিচিতি জানো না। তবে আমরা তোমাদের চিনি। তোমরা তো জীবনচক্রের নদীতে দ্রুতই আবর্তিত হও। পিছন ফিরে একবারও তাকাও না— আমরা কোথায়। নদীর কূলে বসে আমরা তোমাদের দেখতে পাই। শুনি তোমাদের হৃদয়ের ফিসফিসানী। তোমরা ভ্রুক্ষেপ করো না আমাদের আত্ম চিৎকারের প্রতি; কারণ কালের ড্রেজারের আওয়াজ ভরে দিয়েছে তোমাদের কর্ণকুহর। আমরা শুনি অবেলায় তোমাদের গান। নিঃসীম রজনীর স্পষ্ট সুর লহরি উজার করে দিয়েছে আমাদের কর্ণ দেয়াল। আমরা তোমাদের দেখি। তোমরা দাঁড়িয়ে আছো অন্ধকারাচ্ছন্ন নিবিড় কুহেলিকায়। আমরা বাসকরি আলো ঝলমলে আঁধারের পৃথিবীতে। তোমরা আমাদের দেখবে কি করে! আমরা দুঃখিনী মায়ের সন্তান। আমরা আম্বিয়া। আমরা উন্মাদ করি। কালের গিটারে মিউজিক বাজিয়ে চলি সারাকাল। আমরা আপন হৃদয়ের সুতোয় গেঁথে চলি ঈশ্বরের জামা। হৃদয়ের বুনোফুল দিয়ে ভরে দেই ফেরেশতাদের অঞ্জলি। তোমরা তো আনন্দ-উল্লাসে, উদাসীনতার বুক চিরে জন্মানো— জাগ্রত ভোগের প্রভু! নিজেদের বুক ফেঁড়ে, হৃদপিণ্ড বের করে, মেলে ধরো নির্জনতার কাছে। কারণ নির্জনা প্রেমিকার হাত বড় কোমল! অজ্ঞতার দীক্ষা নিয়ে আনন্দকে খুঁজে বেড়াও। অজ্ঞতার তাজমহল তো আয়না থেকে শূন্য। কীভাবে দেখবে নিজেদের শুঁয়ো মুখো চেহারা!

আক্ষেপ



 আচ্ছা, মানুষের জীবন এমন কেন? আঁকাবাঁকা! বেদনাবিধুর! বিষাদময়! রেললাইনের মতো সমান্তরাল ধারায় কি জীবন চলতে পারে না? যদি এমন হতো- মানুষের জীবনে কোন দুঃখই থাকতো না। থাকতো শুধু Low-income, আরাম ও আয়েশ।

ফেলা আসা দিনগুলো

 


 জামতলীর দিনগুলো... 

 গ্রামে ফারুক নামে আমার এক প্রতিবেশী আছে। কৈশোরের দিনগুলোর বড় একটা অংশ তার সাথেই কেটেছে। চৈত্রী দুপুরে- ছাতিফাটা রোদে মাঠ-ঘাট যখন খাঁ খাঁ করতো— মা আমাকে বিছানায় নিয়ে ঘুমপাড়ানি গানে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। আমিও চক্ষুবুজে চুপকরে থাকতাম। মায়ের হাতটা যখন থেমে যেতো, চোখমেলে দেখতাম- মা ঘুমিয়ে পড়েছে। পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসতাম। এসে দেখতাম ঘরের পিছনে সজীব, মীম ও নাঈমসহ ফারুক আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তারাও ঘুমফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এসেছে। ফারুকের নেতৃত্বে ধানক্ষেত পেরিয়ে ছুটে যেতাম খাঁ-দের খেজুর বাগানে— সেখানে বড়সড় একটা জামগাছ আছে। ধানক্ষেতের ভেপসা গরম, মাথার উপর কাঠফাটা রোদ এরমাঝে আলপথে হেঁটে চলা! টসটসে লাল হয়ে যেতাম। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরতো। জামের নেশায় তখন এসব কিছুই মনে হতো না। জামতলীতে এসেই ধপ্ করে বসে পরতাম। আর ফারুক কয়েক লাফেই জামগাছের মাথায় উঠে যেতো। যেকোনো গাছ বাইতে বড্ডপটু সে! তারপর উঠতো— নাঈম, সজীব ও মীম। সবার শেষে উঠতাম আমি। ফারুক, নাঈম আর সজীব গাছের মগডাল থেকে থোকা থোকা জাম নিয়ে আসতো। মীম ও আমি সেগুলো জমা করতাম। সাথে নিয়ে যাওয়া পলিথিন ভরে গেলে, ফারুক ও নাঈম জামগুলো নিয়ে আগে নেমে যেতো। তারপর আমরা নেমে আসতাম। জামতলীতে বসে জামগুলো সমানভাবে ভাগ করতাম। কেউ কোন অংশে কমবেশি করতাম না। তারপর প্রাপ্ত জামগুলো কলাপাতা কিংবা কচুপাতায় মুড়িয়ে নিয়ে আলপথে ছুটে যেতাম পাকুড়তলীতে। পাকুড়ের শিকড়ে বসে বসে জাম খেতাম আর পা-গুলো ঝুলিয়ে দিতাম পুকুরের পানিতে! পাকুড়গাছে পাখিদের হৈচৈ, পানিতে রোদের কিরণ, আর স্নিগ্ধ বাতাসে কাঁচা ধানের মৌ মৌ গন্ধ ভেষে আসতো! আহ, কী-যে ভালো লাগত!! রূপকথার নানান গল্পে মেতে যেতাম আর জামের বিচি দিয়ে পানিতে ঢিলছুড়ার প্রতিযোগিতা করতাম। এভাবেই কেটে যেতো গ্রীষ্মের দুপুর...

হতাশা

 


মানুষের জীবনে সবচে’ বেদনাদায়ক বিষয় হলো 'হতাশা'। হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি নিজেকে বড় অসহায়বোধ করে। বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়াবার কেউ থাকে না। সহযোগিতায় কেউ এগিয়ে আসে না। আত্মবিশ্বাসী কেউ থাকে না। তবুও সে অনেক ঝড়-ঝাপটা উপেক্ষা করে সামনে অগ্রসর হতে চায়। জীবন সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চায়। এমনকি কিছু পথ এগিয়েও যায়। কিন্তু গুলি খাওয়া পাখির ন্যায় উড়তে চেয়েও উড়ে যেতে পারে না। বহু চেষ্টা-প্রচেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হয়। এক সময় সে ভেঙেপড়ে হতাশায়। আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। 

মানুষ এখন নিজেকে নিয়ে বড় বেশী ব্যস্ত। কাউকে সময় দিতে চায় না। কারো সঙ্গী হতে চায় না। কারো সঙ্গ দিতে চায় না। 

এই জীবনে যারা হতাশাগ্রস্ত তাদের আমি ভালোবাসি। তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই। তাদের সান্ত্বনার বাণী শোনাতে চাই।

আমিও হতাশায় দগ্ধ হয়েছিলাম। বহু ঝড়-ঝাপটা ও বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছিলাম। তখন আমিও কামনা করেছিলাম, কোন দরদী বন্ধু এসে আমাকে সান্ত্বনা দিবে আর বলবে—

ভয় কিসের বন্ধু? আমি আছি তোমার পাশে...

মৃত্যু



মৃত্যু একটি মহা দুর্ঘটনা। যা সহজ হয়ে গেছে এবং এমন এক কঠিন ছোঁয়া— যা সহনীয় হয়ে গেছে। দুনিয়ার কর্মকাণ্ড এমন দুঃসহ হয়ে পড়েছে- যারফলে মৃত্যু হয়েছে তার অতি হালকা দুর্ঘটনা। দুনিয়া এমন সব অপরাধ সংঘটিত করেছে যে, মৃত্যু হলো তার অতি ছোট্ট অপরাধ! তুমি তোমার ডানদিকে তাকিয়ে দেখো—কেবল কষ্টছাড়া কিছুই নেই। বামদিকে তকিয়ে দেখো— কেবল আক্ষেপছাড়া কিছুই নেই।



ফুটপাতে শুয়ে থাকা লোকটাও মানুষ। সুতরাং তাকে দেখে নাক ছিটকাবেন না।

গ্রামের মুক্ত-মধুর বাতাস- বারবার অনুভূতিহীন করেছে আমায়...

 

জনপ্রিয়গুলো দেখুন